The Muslim Minds এর বুদ্ধিবৃত্তিক গবেষণা, প্রকাশনা ও দাওয়াহ কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা রক্ষায় আপনিও শামিল হতে পারেন। Total Raised: ৳0 এখনই ডোনেট করুন Help us to grow, Donate now

পাশ্চাত্যবাদ

পাশ্চাত্যবাদ [OCCIDENTALISM]

Share
Share

পাশ্চাত্যবাদ [OCCIDENTALISM]

আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় পাশ্চাত্যবাদ বা অক্সিডেন্টালিজম। তবে পাশ্চাত্যবাদকে গভীরভাবে বোঝার জন্য প্রথমেই প্রাচ্যবাদ বা ওরিয়েন্টালিজম সম্পর্কে একটি প্রাথমিক ধারণা থাকা প্রয়োজন। এর প্রধান কারণ হলো, পাশ্চাত্যবাদের উদ্ভব ঘটেছে মূলত প্রাচ্যবাদের প্রতিক্রিয়া হিসেবেই।

প্রাচ্যবাদ (Orientalism) কী?

প্রাচ্যবাদ বা ওরিয়েন্টালিজম ধারণার প্রবর্তক হলেন ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত বুদ্ধিজীবী এডওয়ার্ড সায়িদ। ১৯৩৫ সালে এক খ্রিষ্টান পরিবারে তাঁর জন্ম। ১৯৪৮ সালের ‘নাকবা’ বা মহাবিপর্যয়ের সময় ফিলিস্তিনি মুসলিমদের পাশাপাশি বিপুল সংখ্যক খ্রিষ্টানকেও বাস্তুচ্যুত করা হয়েছিল—সায়িদের পরিবারও ছিল সেই তালিকার অন্তর্ভুক্ত। উদ্বাস্তু হয়ে তিনি প্রথমে মিশরে এবং পরবর্তীকালে সপরিবারে যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী হন। সেখানে তিনি অধ্যাপনা পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকালেই তিনি একটি বিষয় অত্যন্ত নিবিড়ভাবে লক্ষ্য করেন:

একজন আরব হিসেবে তাঁর ব্যক্তিগত অনুভূতি ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে পশ্চিমা গণমাধ্যমে প্রদর্শিত আরব বিশ্বের চিত্রায়ণের এক আকাশ-পাতাল ব্যবধান ছিল।

তিনি সচক্ষে দেখছিলেন যে, আরবরা সেখানে নিপীড়িত এবং ইসরায়েলিরা দখলদার—যার ফলে খোদ তাঁকেই বাস্তুচ্যুত হতে হয়েছে। অথচ পশ্চিমা গণমাধ্যমে তিনি ঠিক এর বিপরীত চিত্র লক্ষ্য করেন। সেখানে দেখানো হচ্ছে, ইসরায়েলিরাই যেন প্রকৃত নির্যাতিত পক্ষ, আর ফিলিস্তিনিরা তাদের ওপর নিপীড়ন চালাচ্ছে। নিজের যাপিত জীবনের রূঢ় বাস্তবতা আর মিডিয়ার এই কল্পিত রূপায়ণের মধ্যকার আকাশ-পাতাল ব্যবধান তাঁকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলল। তিনি প্রশ্ন তুললেন—বাস্তব অভিজ্ঞতা আর উপস্থাপিত এই ভাষ্যের মধ্যে কেন এই চরম বৈপরীত্য?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই তিনি ব্যাপক পড়াশোনা ও গবেষণায় নিমগ্ন হন। বিশেষ করে উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি বা ১৮৫০-এর দশকের পরবর্তী সময়ে পশ্চিমা পরিব্রাজক এবং পণ্ডিতদের রচিত গ্রন্থগুলো বিশ্লেষণ করে তিনি একটি বিস্ময়কর বিষয় উন্মোচন করেন। তিনি লক্ষ্য করেন, এই লেখকগণ প্রাচ্য বা পূর্বকে একটি বিশেষ ‘লেন্স’ বা দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বিচার করেছেন। সেই দৃষ্টিভঙ্গির মূলে ছিল এক ধরণের শ্রেষ্ঠত্ববাদ: যেখানে পশ্চিমকে উপস্থাপন করা হয়েছে উন্নত, সভ্য, সুসংস্কৃত এবং শিক্ষিত হিসেবে; আর প্রাচ্যকে দেখানো হয়েছে অবনত, অসভ্য, সংস্কৃতিহীন ও অশিক্ষিত জনপদ হিসেবে। এই দ্বান্দ্বিক বিভাজনের ওপর ভিত্তি করেই তাঁরা তাঁদের সাহিত্য ও গবেষণা কর্মগুলো রচনা করেছেন। যার ফলে মূলত দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে।

এই সমস্ত রচনার মধ্য দিয়ে প্রাচ্য সম্পর্কে পাশ্চাত্যের মানুষের মনে একটি নির্দিষ্ট ধারণা বা ‘ইমেজ’ গেড়ে বসে, যা তাদের মানসপটে প্রাচ্যের একটি কাল্পনিক অবয়ব তৈরি করে দেয়। ফলে বাস্তব অভিজ্ঞতার আগেই তারা প্রাচ্য সম্পর্কে একটি বদ্ধমূল ধারণা লাভ করে। পরবর্তীতে ঔপনিবেশিক শাসনামল শুরু হলে পশ্চিমারা যখন সশরীরে প্রাচ্যের দেশগুলোতে পদার্পণ করে, তখন তারা এক চরম বিস্ময়ের সম্মুখীন হয়। তারা দেখতে পায়, তাদের এতদিনকার লালিত ধারণা বা বইপত্রে পড়া তত্ত্বের সাথে বাস্তবতার কোনো মিল নেই; বরং তাত্ত্বিক সেই নির্মাণ আর বাস্তব জগত সম্পূর্ণ আলাদা।

বাস্তবতার সাথে এই তাত্ত্বিক অমিল ধরা পড়ার পর পশ্চিমাদের সামনে দুটি পথ খোলা ছিল।

প্রথমত, প্রাচ্য সম্পর্কে তাদের দীর্ঘদিনের ভুল ধারণাগুলো সংশোধন করা এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে নিজেদের চিন্তা-চেতনাকে আমূল বদলে ফেলা। দ্বি

তীয়ত, নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ববাদী চিন্তার আড়ালে এই প্রাচ্যকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা এবং খোদ প্রাচ্যের মানুষের মনোজগতে সেই হীনম্মন্যতা ঢুকিয়ে দেওয়া—যাতে তারা নিজেদেরকে পশ্চিমাদের চোখ দিয়েই দেখতে শুরু করে।

ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক কারণে পশ্চিমারা দ্বিতীয় পথটিই বেছে নিয়েছে। এর ফলে প্রাচ্যের মানুষের মধ্যে এমন এক কৃত্রিম আত্মপরিচয় গড়ে উঠেছে, যা মূলত পশ্চিমেরই চাপিয়ে দেওয়া একটি বয়ান। বর্তমান সময়েও আমরা এর ব্যাপক প্রভাব লক্ষ্য করি। এই পুরো প্রক্রিয়াটি একটি সুসংগঠিত প্রকল্পের মতো অত্যন্ত সুচারুভাবে সমাজ ও সংস্কৃতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রাচ্যবাদ বা ওরিয়েন্টালিজম কেবল ভৌগোলিক শাসন নয়, বরং এটি হলো সাংস্কৃতিকভাবে আধিপত্য বিস্তার করার একটি সূক্ষ্ম ও সুদূরপ্রসারী প্রক্রিয়া।

এই ব্যবস্থার ফলে সবচেয়ে বড় যে সংকটটি তৈরি হয়েছে তা হলো—পশ্চিমের কোনো ব্যক্তি যদি স্বাধীনভাবে কিংবা বাস্তবতার নিরিখে প্রাচ্যকে জানতে চান, তবে তাঁর সামনে আর কোনো বিকল্প পথ খোলা নেই। কারণ, প্রাচ্যকে জানার জন্য যে সমস্ত জ্ঞানতাত্ত্বিক মাধ্যম বা তথ্যসূত্রের ওপর তাঁকে নির্ভর করতে হয়, তার প্রতিটি স্তরেই প্রাচ্যবাদী বা ওরিয়েন্টালিস্ট চিন্তা কাঠামোগতভাবে প্রতিষ্ঠিত। ফলে কেউ যখন এই পদ্ধতিগুলোর মধ্য দিয়ে জ্ঞান অর্জন করেন, তখন অবচেতনভাবেই তাঁর চিন্তা সেই নির্দিষ্ট ছাঁচে গঠিত বা ‘পরিশুদ্ধ’ হয়ে যায়।

এডওয়ার্ড সায়িদই সর্বপ্রথম এই সুগভীর ষড়যন্ত্রটিকে চিহ্নিত করেন এবং দেখান যে, প্রাচ্যকে শাসন করা হচ্ছে মূলত একটি সুসংগঠিত বুদ্ধিবৃত্তিক প্রকল্পের মাধ্যমে। তিনি মিশেল ফুকোর দর্শনের আলোকে প্রাচ্যবাদকে ব্যাখ্যা করেছেন। সায়িদ দেখিয়েছেন যে, যারা এই জ্ঞানতাত্ত্বিক ব্যবস্থার ভেতর দিয়ে পরিচালিত হয়, তাদের চিন্তাশক্তি ও মনোজগত শেষ পর্যন্ত এক ধরণের বুদ্ধিবৃত্তিক দখলদারিত্বের কবলে পড়ে যায়।

এটিই মূলত এডওয়ার্ড সাইদের ‘ওরিয়েন্টালিজম’ বা প্রাচ্যবাদ তত্ত্বের মূল নির্যাস। পাশ্চাত্যবাদ বা অক্সিডেন্টালিজমকে সঠিকভাবে বোঝার জন্য প্রাচ্যবাদের কিছু মৌলিক ধারণা অনুধাবন করা অপরিহার্য; যার মধ্যে অন্যতম হলো ‘সেলফ অ্যান্ড আদার’ (Self and Other) বা ‘স্ব’ ও ‘পর’—এর দ্বান্দ্বিকতা। পশ্চিমারা নিজেদেরকে ‘সেলফ’ বা মূল পক্ষ হিসেবে বিবেচনা করে, যাদের একটি নির্দিষ্ট আত্মপরিচয় রয়েছে। তাদের মতে, তারা যুক্তিবাদী, প্রগতিশীল এবং সুশৃঙ্খল। এর বিপরীতে তারা অবশিষ্ট বিশ্বকে ‘আদার’ বা ‘অপর’ হিসেবে চিহ্নিত করে। তাদের লেন্স বা দৃষ্টিভঙ্গিতে এই ‘অপর’ পক্ষ সবসময়ই যুক্তিহীন, আবেগতাড়িত এবং অনগ্রসর।

কোনো জনগোষ্ঠীকে বা সংস্কৃতিকে এভাবে হীনবল করে চিত্রিত করার প্রক্রিয়াকেই বলা হয় ‘আদারিং’ (Othering) বা ‘অপরীকরণ’। প্রাচ্যবাদের ক্ষেত্রে এই ধারণাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর মাধ্যমেই পশ্চিমারা নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব এবং অন্যদের থেকে নিজেদের স্বাতন্ত্র্য জাহির করে।

এই পুরো প্রক্রিয়ার পেছনে সবচেয়ে প্রভাবশালী অনুষঙ্গটি হলো ‘ক্ষমতা’। ওরিয়েন্টালিজমের মূল দর্শনই হলো—পশ্চিমারা কেবল সামরিক শক্তিতেই বলীয়ান ছিল না, বরং তাদের শাসনব্যবস্থাকে দীর্ঘস্থায়ী ও ন্যায়সংগত করতে তারা ‘জ্ঞান উৎপাদন’কে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। অর্থাৎ, ক্ষমতাকে সুসংহত করার জন্যই তারা প্রাচ্য সম্পর্কে একপেশে ও বিকৃত জ্ঞান তৈরি করেছে। প্রকৃতপক্ষে, ক্ষমতার এই বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চাই হলো ওরিয়েন্টালিজমের মূল ভিত্তি।

পাশ্চাত্যবাদ (Occidentalism) কী?

Occident ফরাসি শব্দ। এর অর্থ হচ্ছে পশ্চিম; ইউরোপের পশ্চিম অংশকে বলা হয় Occident বা পশ্চিম। আর Occidentalism বা পাশ্চাত্যবাদ মানে হলো: Occident বা পশ্চিমের বাইরের লোকেরা পশ্চিমকে যেভাবে দেখে। প্রাচ্যবাদ বা Orientalism মানে হলো হলো: পশ্চিমের লোকেরা পশ্চিমের বাইরের লোকদের কীভাবে দেখে। 

Occidentalism এর একাডেমিক সংজ্ঞা বিভিন্ন মহলে বিভিন্নভাবে দেখা যায়। এর তিনটি মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি আছে, এর ফলে সংজ্ঞার মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য দেখা যায়। একপক্ষের সংজ্ঞার সাথে আরেকপক্ষের সংজ্ঞার সাথে কোনো মিল পাওয়া যায় না।

দৃষ্টিভঙ্গি তিনটি হলো-

  • হাসান হানাফি-র দৃষ্টিভঙ্গি।
  • ইয়ান বুরুমা ও আভিশাই মারগালিটের দৃষ্টিভঙ্গি।
  • ‘পশ্চিমই পৃথিবীর কেন্দ্র’ দৃষ্টিভঙ্গি।

১. হাসান হানাফি-র দৃষ্টিভঙ্গি

হাসান হানাফি প্রথম পাশ্চাত্যবাদ নিয়ে কথা বলেন। ১৯৯২ সালে তিনি ‘মুকাদ্দিমা ফি ইলমিল ইসতিগরাব’ নামে একটি বই প্রকাশ করেন, যার অর্থ হলো ‘পাশ্চাত্যবাদ বিজ্ঞানের ভূমিকা’। তিনিই প্রথম এই শব্দটি ব্যবহার করেন। এই গ্রন্থে তিনি একটি প্রাথমিক ধারণা দিয়ে তাত্ত্বিকদের আহ্বান জানান যে, প্রাচ্যবাদ যেমন একটি দর্শন, এর বিপরীতে পাশ্চাত্যবাদকেও যেন একটি স্বতন্ত্র দর্শন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়। তারপর তিনি ২০০৫ সালের দিকে আরো একটি বই প্রকাশ করেন, সেখানে তিনি একে তাত্ত্বিকভাবে ব্যাখ্যা করেছেন।

হাসান হানাফির মতে, পাশ্চাত্যবাদ বোঝার আগে এর উৎস সম্পর্কে জানা জরুরি। এডওয়ার্ড সায়িদের মতো তিনিও এই ধারণাটি মিশেল ফুকোর দর্শন থেকে গ্রহণ করেছেন। ফুকো যখন কোনো বিষয় বা ‘ডিসকোর্স’ বিশ্লেষণ করেন, তখন তিনি দেখেন যে সেটি কেবল একটি উৎস থেকে নয়, বরং বিভিন্ন দিক থেকে প্রবাহিত হয়। হানাফি এই উপাদানগুলোকে ‘ফ্রন্ট’ নামে অভিহিত করেছেন এবং তিনটি প্রধান ফ্রন্ট চিহ্নিত করেছেন:

  • প্রথম ফ্রন্ট (ঐতিহ্যবাদী ধারা): একে তিনি ‘সাপোর্টার অব ওল্ড হেরিটেজ’ বা ‘তুরাস’ বলেছেন। এখানে তিনি মূলত দুই ধরণের মানুষকে বুঝিয়েছেন—এক. সালাফি বা যারা আক্ষরিক ইসলাম অনুসরণ করতে চায়, এবং দুই. জাতীয়তাবাদী। এই উভয় শ্রেণির মধ্যে একটি সাধারণ প্রবণতা হলো অতীতের প্রতি প্রবল আকর্ষণ। তারা বিশ্বাস করে, আমাদের অতীতই ছিল সোনালী যুগ এবং গৌরব পুনরুদ্ধারের জন্য সেই অতীতেই ফিরে যেতে হবে।
  • দ্বিতীয় ফ্রন্ট (পাশ্চাত্য অনুরাগী ধারা): একে তিনি বলেছেন ‘লাভার অব দ্য ওয়েস্ট’। প্রাচ্যের এই অংশটি পশ্চিমকে শ্রেষ্ঠ মনে করে এবং বিশ্বাস করে যে, উন্নতি করতে হলে আমাদের পুরোপুরি পশ্চিমের মতো হতে হবে।
  • তৃতীয় ফ্রন্ট (সমন্বয়বাদী ধারা): এই ধারায় তিনি পশ্চিম ও অপশ্চিমের মধ্যে একটি সমন্বয় করতে চেয়েছেন। এখানে অক্সিডেন্টের বাইরের মানুষগুলো নিজেদের এবং পশ্চিমকে বস্তুনিষ্ঠভাবে বিশ্লেষণ করে। তারা বিচার করে দেখে যে, পশ্চিমের কোন বিষয়গুলো ইতিবাচক এবং কোনটি নেতিবাচক; কোনগুলো আমাদের সমাজের জন্য প্রযোজ্য আর কোনগুলো নয়। যা উপযুক্ত তারা কেবল সেটুকুই গ্রহণ করে, বাকিটা বর্জন করে।

এই তিনটি ফ্রন্টই হাসান হানাফির পাশ্চাত্যবাদ বা অক্সিডেন্টালিজমের ডিসকোর্স গঠনের মূল ভিত্তি। তাঁর আলোচনার সারকথা হলো—অক্সিডেন্টালিজম মূলত ওরিয়েন্টালিজমের একটি বিপরীত প্রক্রিয়া। প্রাচ্যবাদ বা ওরিয়েন্টালিজমের মাধ্যমে পশ্চিমারা এতদিন প্রাচ্যের একটি নির্দিষ্ট ভাবমূর্তি তৈরি করে এসেছে। এখন প্রাচ্যের মানুষ নিজেরাই অক্সিডেন্টালিজমের মাধ্যমে নিজেদের এক স্বতন্ত্র পরিচয় বা ইমেজ গড়ে তুলছে।

যেভাবে পশ্চিমারা ওরিয়েন্টালিজমের মাধ্যমে ‘সেলফ’ (স্ব) ও ‘আদার’ (অপর) এর ধারণা তৈরি করেছিল, ঠিক একইভাবে প্রাচ্যও এখন অক্সিডেন্টালিজমের মাধ্যমে নিজস্ব ‘স্ব’ ও ‘পর’ এর সংজ্ঞা নির্ধারণ করছে। এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তারা চিহ্নিত করছে যে, কোন কোন ক্ষেত্রে তারা পশ্চিম থেকে আলাদা এবং স্বকীয়তা বজায় রাখতে কোন কোন জায়গায় তাদের পৃথক থাকা জরুরি।

হাসান হানাফি এই তত্ত্বের সাংস্কৃতিক দিকটি অত্যন্ত নিপুণভাবে চিহ্নিত করেছেন। তাঁর মতে, ওরিয়েন্টালিজম বা প্রাচ্যবাদ আমাদের মাঝে এমন এক ভ্রান্ত ধারণা ছড়িয়েছে যে, পৃথিবীতে কেবল একটিই সংস্কৃতি বিদ্যমান—আর তা হলো পশ্চিমা সংস্কৃতি। এর মাধ্যমে পশ্চিমারা বোঝাতে চায় যে, তাদের সংস্কৃতিই একমাত্র মানদণ্ড এবং বাকি সব জনপদ আসলে অসংস্কৃতিবান। ফলে কেউ যদি নিজেকে ‘সংস্কৃতিবান’ হিসেবে গড়তে চায়, তবে তাকে পশ্চিমা সংস্কৃতিই গ্রহণ করতে হবে।

কিন্তু হাসান হানাফি এই ধারণা চ্যালেঞ্জ করে বলেন, পৃথিবীতে একক কোনো সংস্কৃতি নেই। আফ্রিকা, এশিয়া কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি জনপদের নিজস্ব সংস্কৃতিই প্রকৃত সংস্কৃতি। পশ্চিমা সংস্কৃতিও বিশ্বের অসংখ্য সংস্কৃতির মধ্যে একটি সাধারণ সংস্কৃতি মাত্র; এর বিশেষ কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। এভাবেই তিনি পাশ্চাত্যবাদ বা অক্সিডেন্টালিজমকে প্রাচ্যবাদের বিরুদ্ধে একটি ‘বুদ্ধিবৃত্তিক বিদ্রোহ’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।

তিনি আরও একটি বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছেন—পূর্ব বা প্রাচ্য যদি নিজের অস্তিত্ব রক্ষা করতে চায়, তবে তাকে অবশ্যই নিজের সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখতে হবে। নিজস্ব সংস্কৃতি টিকে থাকলে তবেই প্রাচ্য টিকে থাকবে এবং এর মাধ্যমেই পশ্চিমের আধিপত্য থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব হবে।

এই দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে অক্সিডেন্টালিজমের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে তিনি বলেন: Occidentalism is the study of the West. অর্থাৎ, পাশ্চাত্যবাদ হলো পশ্চিমকে গভীরভাবে অধ্যয়ন বা বিশ্লেষণ করা। এই বিশ্লেষণ অর্থনীতি, সংস্কৃতি, রাজনীতি কিংবা শিক্ষা—যেকোনো ক্ষেত্রে হতে পারে। তিনি এই সংজ্ঞাটিকে বেশ ব্যাপক রেখেছেন এবং বলেছেন, পশ্চিমকে নিয়ে যে কোনো ধরণের বিশ্লেষণধর্মী আলোচনা বা গবেষণাই পাশ্চাত্যবাদের অন্তর্ভুক্ত।

২. ইয়ান বুরুমা ও আভিশাই মারগালিটের দৃষ্টিভঙ্গি

পাশ্চাত্যবাদ বা অক্সিডেন্টালিজমের দ্বিতীয় ধারাটি গড়ে তুলেছেন নেদারল্যান্ডের তাত্ত্বিক ও লেখক ইয়ান বুরুমা এবং ইসরায়েলি দার্শনিক আভিশাই মারগালিট। ২০০৪ সালে প্রকাশিত তাঁদের ‘Occidentalism: The West in the Eyes of Its Enemies’ গ্রন্থে তাঁরা এই ভিন্নধর্মী ধারণাটি উপস্থাপন করেন।

তাঁদের মতে, পাশ্চাত্যবাদ হলো পশ্চিমের বাইরের সংস্কৃতিগুলোর মধ্যে বিদ্যমান পশ্চিম-বিদ্বেষী মনোভাব। অর্থাৎ, অ-পশ্চিমা দেশগুলো পশ্চিমকে শত্রু হিসেবে বিবেচনা করে যেসব নেতিবাচক চিন্তা, দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রতিক্রিয়া দেখায়, তাকেই তাঁরা অক্সিডেন্টালিজম বলেছেন।

তাঁরা এই ধারার সূচনা চিহ্নিত করেছেন ১৯৪২ সালে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানিরা যখন বুঝতে পারছিল তারা পরাজয়ের দিকে যাচ্ছে, তখন একদল জাপানি বুদ্ধিজীবী কিয়োটো শহরে এক সম্মেলনে মিলিত হন। তাঁদের আলোচনার মূল বিষয় ছিল—কীভাবে পশ্চিমা আধুনিকতার আগ্রাসন মোকাবিলা করে জাপানের নিজস্ব সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ রক্ষা করা যায়। বুরুমা ও মারগালিট এই সম্মেলনকেই ‘পশ্চিমের বিরুদ্ধে পূর্বের বিদ্রোহের সূচনা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

তাঁদের এই তত্ত্বে পশ্চিমের প্রতি ঘৃণাকেই পাশ্চাত্যবাদের মূল ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়েছে। তাঁরা একে এতটাই বিস্তৃত করেছেন যে, মডার্নিটিবিরোধী সবাইকে তাঁরা ‘অক্সিডেন্টালিস্ট’ হিসেবে গণ্য করেন। এমনকি তাঁদের দাবি অনুযায়ী, অক্সিডেন্টালিজমের প্রকৃত সূচনা হয়েছিল খোদ পশ্চিমে হিটলারের নাৎসিবাদী উত্থানের মাধ্যমে, যা পরবর্তীতে বাকি বিশ্ব অনুসরণ করেছে।

তবে তাঁদের এই দৃষ্টিভঙ্গি বেশ ত্রুটিপূর্ণ ও স্ববিরোধী। একদিকে তাঁরা বলছেন পশ্চিমের প্রতি ঘৃণা হলো অক্সিডেন্টালিজম, আবার বলছেন এর জন্ম খোদ পশ্চিমেই। এর অর্থ দাঁড়ায়—পশ্চিম নিজেই নিজেকে ঘৃণা করে। হাসান হানাফি ও অন্যান্য চিন্তাবিদগণ এই বৈপরীত্যটি স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করেছেন। তাঁদের মতে, বুরুমা ও মারগালিট পূর্বকে এমনকি পশ্চিমের ‘শত্রু’ হওয়ার যোগ্য হিসেবেও মনে করেন না। তাঁদের ধারণা অনুযায়ী, পশ্চিমের শত্রু হওয়ার যোগ্যতা কেবল পশ্চিমেরই আছে; তাই পূর্ব যদি পশ্চিমের বিরোধিতা করতে চায়, তবে তা-ও হতে হবে পশ্চিমের কোনো আদর্শ (যেমন নাৎসিবাদ বা ফ্যাসিবাদের) অনুকরণের মাধ্যমে।

৩. ‘পৃথিবীর কেন্দ্র পশ্চিম’ দৃষ্টিভঙ্গি

অক্সিডেন্টালিজমের তৃতীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে ধরে নেওয়া হয় যে, পশ্চিম হলো পৃথিবীর কেন্দ্র, আর প্রাচ্য বা বাকি বিশ্ব সেই কেন্দ্রের দিকে ধাবিত হচ্ছে। একে বলা হয় কেন্দ্রের দিকে যাত্রা বা ‘Journey towards the Center’। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিভাষায় এই ধারণাটি ‘Core and Periphery’ তত্ত্বের সাথে সংগতিপূর্ণ। এখানে ‘কোর’ হলো পশ্চিম এবং ‘পেরিফেরি’ হলো প্রান্তিক অঞ্চলসমূহ। এই প্রান্তিক অঞ্চলগুলো যদি কেন্দ্রের স্তরে পৌঁছাতে চায়, তবে পশ্চিম যেভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠেছে, সেই প্রক্রিয়া ও মূল্যবোধগুলোকে তাদের আত্মস্থ করতে হবে।

পশ্চিমের মূল্যবোধ ও সংস্কৃতিকে কীভাবে মূল্যায়ন এবং গ্রহণ করা হবে, তা নির্ধারণ করাই হলো অক্সিডেন্টালিজম। এই ধারণাটি হাসান হানাফির ‘তৃতীয় ফ্রন্ট’ বা সমন্বয়বাদী ধারার সাথে মিলে যায়; যেখানে পশ্চিমের ইতিবাচক দিকগুলো গ্রহণ এবং নেতিবাচকগুলো বর্জনের কথা বলা হয়েছে। তবে এই ধারায় অঞ্চলভেদে নানা বৈচিত্র্য ও বৈপরীত্য লক্ষ্য করা যায়। মোটাদাগে, প্রাচ্য কীভাবে নিজেকে বিশ্বের কেন্দ্রে উন্নীত করতে পারে, সেই প্রক্রিয়াই এখানে প্রধান্য পায়।

বাস্তবতার নিরিখে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ইয়ান বুরুমা ও আভিশাই মারগালিটের ‘শত্রুভাবাপন্ন’ দৃষ্টিভঙ্গিটি গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, ওরিয়েন্টালিজম বা প্রাচ্যবাদের মূলে ছিল ক্ষমতা ও জ্ঞানের সম্পর্ক। পশ্চিমারা শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিল বলেই তারা প্রাচ্য সম্পর্কে একপেশে ও বিকৃত জ্ঞান তৈরি করতে পেরেছিল। এখন অক্সিডেন্টালিজমকে যদি ওরিয়েন্টালিজমের হুবহু বিপরীত বা শত্রুভাবাপন্ন হতে হয়, তবে প্রাচ্যকেও পশ্চিমের ওপর শাসনক্ষমতা বিস্তার করতে হবে এবং তাদের ইতিহাসকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করতে হবে—যা বাস্তবে ঘটছে না।

তাই হাসান হানাফির মতবাদই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য। তাঁর মতে, অক্সিডেন্টালিজম হলো অপশ্চিমী দেশগুলোর নিজস্ব ‘আত্মসচেতনতা’ গড়ে তোলার লড়াই। এই লড়াই অন্য কারো ওপর আধিপত্য বিস্তারের জন্য নয়, বরং নিজের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে। প্রাচ্য কেবল তখনই টিকে থাকতে পারবে, যখন সে নিজের সংস্কৃতিকে রক্ষা করতে পারবে। আর এই সংস্কৃতির সুরক্ষার জন্য প্রয়োজন গভীর আত্মসচেতনতা, যা পশ্চিমারা ওরিয়েন্টালিজমের মাধ্যমে নিজেদের জন্য অর্জন করেছিল।

হাসান হানাফি ইসলামি বিশ্বের সাথে পাশ্চাত্যের ঐতিহাসিক সাক্ষাৎ এবং পারস্পরিক বোঝাপড়ার প্রকৃতি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। এই সম্পর্কের গতিশীলতা বুঝতে তিনি পাঁচটি প্রধান উপাদান চিহ্নিত করেছেন। এই উপাদানগুলোকে তিনি আবার দুটি মৌলিক উৎসে ভাগ করেছেন:

১. ইসলামি উৎসভিত্তিক উপাদান (দুইটি)

২. পশ্চিমা উৎসভিত্তিক উপাদান (তিনটি)

১. ইসলামিক উৎসভিত্তিক

যখন পশ্চিমের মধ্যযুগ চলছিল, তখন আব্বাসি খিলাফতের অধীনে গ্রিক দর্শনশাস্ত্র আরবি ও সিরিয়াক ভাষায় অনুবাদ হচ্ছিল। আর এই পারস্পরিক সম্পর্ক কোনো সংঘর্ষের ভিতর দিয়ে আসেনি, জ্ঞানচর্চার ভিতর দিয়ে এসেছে। ইসলামি পণ্ডিতরা জ্ঞানগুলো চর্চা করে পশ্চিমের সাথে বোঝাপড়া করেছেন। এখানে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় দেখা যায় যে, ইসলাম বা মুসলিমরা পশ্চিমকে পশ্চিমের আদলে বোঝার চেষ্টা করেছেন। আর এ জন্য তারা পশ্চিমে গিয়ে দেখার চেষ্টা করেছেন গ্রিকরা নিজেদের সম্পর্কে কোন জ্ঞান গড়ে তুলেছে। পরবর্তীতে তাঁরা সেই জ্ঞানটিকে তারা আত্মস্থ করেছেন। 

কিন্তু ওরিয়েন্টালিজমে হুবহু এর বিপরীত হয়েছে। এখানে পূর্ব সম্পর্কে তাদের যে ধারণা ছিল সেটিকেই তারা গড়ে তুলেছে এবং এর আলোকে সবকিছু বিকৃত করার চেষ্টা করেছে।

পশ্চিমের সঙ্গে মুসলিম বিশ্বের বোঝাপড়ার দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম ছিল আন্দালুস (বর্তমান স্পেন)। প্রথম ধাপে এই আদান-প্রদান বাগদাদ কেন্দ্রিক থাকলেও, দ্বিতীয় ধাপে তা আন্দালুসের মাধ্যমে পূর্ণতা পায়। আন্দালুস ভৌগোলিকভাবে ইউরোপের অভ্যন্তরে এবং অক্সিডেন্ট বা পাশ্চাত্যের একদম সন্নিকটে হওয়ায় সেখানে গড়ে ওঠা মুসলিম সভ্যতা ইউরোপীয়দের ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়। হাসান হানাফি এই সময়কালকে, বিশেষ করে ১৩ শতককে ‘স্কলাস্টিক যুগ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

এর আগে ১১ ও ১২ শতকে ক্রুসেড চলাকালীন ক্রুসেডাররা যখন মিসর, ফিলিস্তিন ও সিরিয়ায় আসে, তখন তারা সেখানে গ্রিক দর্শন ও বিজ্ঞানের এক বিশাল ভাণ্ডার খুঁজে পায়। এই মূল্যবান গ্রিক জ্ঞানগুলো তখন আরবিতে অনূদিত অবস্থায় অত্যন্ত সহজলভ্য ছিল, যা ক্রুসেডারদের কাছে আগে পরিচিত ছিল না। তারা এই অনূদিত পাণ্ডুলিপিগুলো সাথে করে নিয়ে যায়, যার ফলে পশ্চিমারা প্রথমবারের মতো উপলব্ধি করে যে, প্রাচ্যে একটি সমৃদ্ধ জ্ঞানতাত্ত্বিক ঐতিহ্য বিদ্যমান।

এই ঘটনা পশ্চিমে একটি বৈপ্লবিক উপলব্ধির জন্ম দেয়। তারা বুঝতে পারে যে, তারা যে গ্রিক জ্ঞান অর্জন করছে, তার প্রধান মাধ্যম হলো আরবি অনুবাদ। এই নির্ভরশীলতা পশ্চিমা চিন্তাবিদদের মধ্যে এক ধরণের সচেতনতা তৈরি করে। তারা সিদ্ধান্ত নেয় যে, গ্রিক জ্ঞানকে সরাসরি বোঝার জন্য আরবি ভাষার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে মূল গ্রিক উৎস থেকেই তা আত্মস্থ করতে হবে।

১৩ শতকের এই নবজাগরণ পশ্চিমে এক নতুন জ্ঞান-আন্দোলনের সূচনা করে। এই যুগেই মুসলিমদের হাত ধরে সংরক্ষিত ও বিকশিত দর্শন, চিকিৎসা, গণিত ও বিজ্ঞানের রচনাবলী পশ্চিমা পণ্ডিতরা পাঠ করতে শুরু করেন। এই জ্ঞানভাণ্ডারের মাধ্যমেই তারা মূলত গ্রিক দর্শনের গভীরে প্রবেশের সুযোগ পায়, যা পরবর্তীতে আধুনিক পশ্চিমা জ্ঞানতত্ত্বের ভিত্তি নির্মাণে সহায়তা করে।

২. পশ্চিমা উৎসভিত্তিক

পশ্চিমের সঙ্গে ইসলামের এই প্রাথমিক সম্পৃক্ততা ছিল মূলত একাডেমিক ও জ্ঞানভিত্তিক। ইসলাম-পাশ্চাত্য সম্পর্কের এই পর্যায়টিকে তাই একটি দ্বিমুখী বুদ্ধিবৃত্তিক বিনিময় হিসেবে দেখা যায়। হাসান হানাফির মতে, পশ্চিমের সাথে ইসলামের এই দীর্ঘকালীন সম্পর্কের তিনটি প্রধান ঐতিহাসিক মাধ্যম ছিল:

১. প্রাথমিক যুগ (ঐতিহাসিক ও সামরিক সংঘাত): রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পরবর্তী যুগে মুসলিমদের সাথে রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্যের সংঘাত শুরু হয়। এটি কেবল সামরিক দ্বন্দ্ব ছিল না, বরং ছিল বহুমুখী রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক বাস্তবতার প্রতিফলন। হাসান হানাফি একে গ্রিক ও রোমান সাম্রাজ্যের প্রেক্ষাপটে মুসলিম ও পশ্চিমের মুখোমুখি অবস্থানের সূচনা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এই সংঘাতের মাধ্যমেই পশ্চিম প্রথমবারের মতো মুসলিমদের শক্তি ও অস্তিত্ব সম্পর্কে সচেতন হয়।

২. মধ্যযুগ (ক্রুসেড): দ্বিতীয় মাধ্যমটি ছিল ক্রুসেডের যুগ। এই সময়ে পশ্চিমা খ্রিষ্টান শক্তিগুলো সরাসরি মুসলিম ভূখণ্ডে প্রবেশ করে দীর্ঘকালীন সামরিক সংঘাতে লিপ্ত হয়। এই প্রত্যক্ষ ও সংঘর্ষমূলক যোগাযোগের মাধ্যমেই পশ্চিমের মনে মুসলিম সমাজ, সংস্কৃতি এবং ধর্ম সম্পর্কে একটি নির্দিষ্ট ও নেতিবাচক ধারণা গড়ে উঠতে শুরু করে।

৩. আধুনিক বা সমকালীন যুগ (Pax Americana Pax Europaea): তৃতীয় মাধ্যমটি হলো ইউরোপীয় ও মার্কিন আধিপত্যের যুগ। এর সূচনা ঘটে ঔপনিবেশিক শাসন আমল থেকে। প্রথমে ইউরোপীয় শক্তিগুলো এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সম্মিলিতভাবে বিশ্ব রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করে। গত দুই শতাব্দী ধরে এই শক্তিগুলো অস্ত্র, দখলদারিত্ব এবং সাংস্কৃতিক আধিপত্যের মাধ্যমে মুসলিম বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করছে। হানাফির মতে, এটিই পশ্চিমা কাঠামোর ভেতরে মুসলিমদের অবস্থান নির্ধারণের তৃতীয় ধাপ।

হাসান হানাফি মনে করেন, পশ্চিমের সাথে মুসলিম বিশ্বের সংঘাতময় যে তৃতীয় পর্যায়—অর্থাৎ ঔপনিবেশিক শাসনের সময়—তার পাল্টা জবাব হিসেবেই ‘পাশ্চাত্যবাদ’ বা অক্সিডেন্টালিজমের জন্ম হয়েছে। পশ্চিমা শক্তিগুলোর জোরপূর্বক দখলদারিত্ব, সাংস্কৃতিক আধিপত্য আর সামরিক হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়েই প্রাচ্যের মানুষের মনে নিজেদের পরিচয় ও অধিকার নিয়ে নতুন এক সচেতনতা তৈরি হয়।

দীর্ঘদিন ধরে শোষিত ও দমিত থাকা এই মানুষগুলো এক সময় জেগে ওঠে। তারা প্রশ্ন করতে শুরু করে—পশ্চিমের এই জ্ঞান, সংস্কৃতি আর ক্ষমতার আসল রূপটি কেমন? তাদের এই আত্মসচেতনতাই মূলত ‘বি-উপনিবেশায়ন’ বা পরাধীনতা থেকে মুক্তির পথ প্রশস্ত করে। আর এই মুক্তি সংগ্রামেরই একটি বড় অংশ হলো অক্সিডেন্টালিজম। বরং এটি একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই। এই লড়াইয়ের লক্ষ্য হলো—পশ্চিমের চাপিয়ে দেওয়া পরিচয়ের বাইরে গিয়ে প্রাচ্যের নিজস্ব চেতনা, ইতিহাস আর ঐতিহ্যকে নতুন করে খুঁজে বের করা এবং তাকে সগৌরবে ফিরিয়ে আনা।



Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Articles
দর্শনপাশ্চাত্যবাদপ্রাচ্যবাদসমসাময়িক বিশ্লেষণ

সেক্যুলার রাষ্ট্রকাঠামোয় শিক্ষা ও চেতনার নিয়ন্ত্রণকৌশল

দর্শন•April 11, 2026দর্শনপাশ্চাত্যবাদপ্রাচ্যবাদসমসাময়িক বিশ্লেষণসেক্যুলার রাষ্ট্রকাঠামোয় শিক্ষা ও চেতনার নিয়ন্ত্রণকৌশলআসিফ আদনান•1 min read30ViewsFacebookXWhatsApp30...

ইসলামের ইতিহাসপাশ্চাত্যবাদসমসাময়িক বিশ্লেষণ

পশ্চিমের আয়নায় ইসলামী সংস্কার ও তার লিগ্যাসি

ইসলামের ইতিহাস•April 7, 2026ইসলামের ইতিহাসপাশ্চাত্যবাদসমসাময়িক বিশ্লেষণপশ্চিমের আয়নায় ইসলামী সংস্কার ও তার লিগ্যাসিখালিদ...

পাশ্চাত্যবাদমডার্নিটিসমসাময়িক বিশ্লেষণ

আধুনিকতা কি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে আরোও ধার্মিক করে তুলছে?

পাশ্চাত্যবাদ•April 4, 2026পাশ্চাত্যবাদমডার্নিটিসমসাময়িক বিশ্লেষণআধুনিকতা কি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে আরোও ধার্মিক করে তুলছে?রিফাহ তাসফিয়াহ...

Support The Muslim Minds