হিটলারবাদ থেকে মাক্রোঁবাদ: রাজনীতির নানা রূপ — ইমানুয়েল টড

১৯৩০-এর দশকের সাথে তুলনা এখন ক্রমশ বাড়ছে। আমেরিকান গণতন্ত্রের এই অবক্ষয় যেন আমাদের জার্মানির ভাইমার প্রজাতন্ত্রের সেই একই অবক্ষয়ের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। ট্রাম্প, সহিংসতা ও মিথ্যাকে উপভোগ করার এবং অশুভের চর্চার মধ্য দিয়ে, আমাদের অনিবার্যভাবে হিটলারের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছেন। ইউরোপে উগ্র-ডানপন্থী হিসেবে চিহ্নিত আন্দোলনগুলোর উত্থান আমাদের ইতিহাসের দিকে তাকাতে বাধ্য করছে।
তবে বর্তমানের পশ্চিমা সমাজ আর ১৯৩০-এর দশকের মতো নেই। এই সমাজ এখন বার্ধক্যের দিকে এগিয়েছে, হয়ে উঠেছে ভোগবাদী আর সেবামুখী; নারীরা এখন স্বাধীন এবং দলীয় আনুগত্যের জায়গা দখল করেছে ব্যক্তিগত উন্নয়ন। ১৯৩০-এর দশকের সেই তরুণ, মিতব্যয়ী, শিল্পনির্ভর, শ্রমিক-প্রধান, পুরুষতান্ত্রিক এবং দলীয় পরিচয়-নির্ভর সমাজের সাথে বর্তমানের তুলনা কীভাবে সম্ভব? এই যে সামাজিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের বিশাল ব্যবধান—এ কারণেই আমি এতকাল বর্তমানের ‘উগ্র-ডানপন্থা’র সাথে অতীতের তুলনাকে অগ্রহণযোগ্য বলে মনে করতাম। কিন্তু রাজনৈতিক মতাদর্শ আজও টিকে আছে, যেমন ছিল আগেও। তাই আমরা চাইলেই এই সম্ভাবনাকে অসম্ভব বলে উড়িয়ে দিতে পারি না যে—এ সময়েও তৈরি হতে পারে বুড়োদের নাৎসিবাদ, ভোগবাদ-ঘেঁষা ফ্রাঙ্কোবাদ, স্বাধীন নারীদের ফ্যাসিবাদ কিংবা এমনকি এলজিবিটি-পন্থী ক্রস-ডি-ফেউবাদ।
এখন আমাদের বর্তমান সময়ের রাজনৈতিক আদর্শগুলোর সাথে ১৯৩০-এর দশকের সেই উত্তাল সময়ের তুলনা করার প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। মূলত পাঁচটি বিশেষ রাজনৈতিক ধারা বা ঘটনার ওপর ভিত্তি করে আমরা এই তুলনামূলক আলোচনাটি করতে পারি। সেগুলো হলো: হিটলারবাদ, ট্রাম্পবাদ, নেতানিয়াহুবাদ এবং লে পেন-বাদ। সবশেষে আমি সংক্ষেপে ফ্রান্সের ম্যাক্রোঁবাদ নিয়ে আলোচনা করব।
বর্তমানে ফ্রান্সের ভেতরে যে অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে, তার মূলে রয়েছে তথাকথিত ‘মধ্যপন্থী’ এবং ‘ইউরোপ-পন্থী’ চরমপন্থা। এই পরিস্থিতি আমাদের বাধ্য করছে বিষয়টি গভীরভাবে খতিয়ে দেখতে। আসলে প্রশ্ন তোলা দরকার—যাকে আমরা ‘মধ্যপন্থা’ বলছি, তা কি আসলেই খুব নমনীয় বা মধ্যপন্থী কিছু? নাকি এটিও এক ধরণের চরমপন্থা?
আমার এই আলোচনার ভঙ্গি হবে অনেকটা উপলব্ধিনির্ভর; এটি যে একেবারে স্বয়ংসম্পূর্ণ বা সবদিক থেকে সঙ্গতিপূর্ণ হবে, এমন কোনো দাবি আমি করছি না। আলোচনাটির উদ্দেশ্য কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো নয়, বরং চিন্তার নতুন পথ খুলে দেওয়া। বিভিন্ন রাজনৈতিক ধারণার মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্ক তুলে ধরার জন্য আমি এখানে বৈশিষ্ট্য এবং রঙগুলোকে কিছুটা বাড়িয়ে বা অতিরঞ্জিত করে দেখাচ্ছি। ইতিহাসের এই দ্রুতগতিকে ধরতে বা আগাম আঁচ করতে আমি জেনেশুনেই এই অতিরঞ্জন করছি। এক্ষেত্রে ‘এক্সপ্রেশনিস্ট’ বা ভাবাবেগবাদী ভঙ্গিই হয়তো আরও বেশি উপযুক্ত রূপক হবে। যাই হোক, বর্ণবাদ বা বিদেশি-বিদ্বেষের সাধারণ প্রেক্ষাপট দিয়েই শুরু করা যাক।
হিটলারবাদ, ট্রাম্পবাদ এবং লে পেন-বাদ—এই তিনটি মতাদর্শের মধ্যেই জাতীয় গণ্ডির বাইরে কোনো ‘অন্য’ পক্ষকে বর্জন করার একটি সাধারণ প্রবণতা দেখা যায়। তবে এই বর্জনের তীব্রতা ও ধরণ ভিন্ন।
হিটলার ও ট্রাম্পের ক্ষেত্রে এই বৈরিতা মূলত সরাসরি বর্ণবাদ-নির্ভর। নাৎসিরা ইহুদিদের জৈবিক বা বংশগতভাবে একটি আলাদা প্রজাতি বলে গণ্য করত। একইভাবে ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন রিপাবলিকান পার্টির প্রধান লক্ষ্যবস্তু হলো কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠী, যাদেরকে তারা জন্মগত বা জৈবিক পরিচয়েই সংজ্ঞায়িত করে।
অন্যদিকে, লে পেন-বাদকে বর্ণবাদের চেয়ে বিদেশি-বিদ্বেষ হিসেবে দেখা যুক্তিযুক্ত। এখানে আরব ও মুসলিমদের আলাদা করা হয় তাদের ধর্ম ও সংস্কৃতির ভিত্তিতে। অভিবাসন নিয়ে ফরাসি উগ্র-ডানপন্থীদের মূল আপত্তি বা আচ্ছন্নতা মূলত ইসলামকে কেন্দ্র করে; সে তুলনায় কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতি তাদের আক্রমণ ততটা তীব্র নয়। এমনকি সামাজিক পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায়, ফ্রান্সে কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের মধ্যে ভিন্ন জাতির সাথে বিয়ের হার বেশ উচ্চ, যা যুক্তরাষ্ট্রে এখনো অত্যন্ত নগণ্য।
পশ্চিমা ‘পপুলিজম’ বা জনতাবাদের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো অভিবাসন বিরোধিতা—এটি বলাই বাহুল্য। ব্রিটেনের রিফর্ম ইউকে, সুইডেন ডেমোক্র্যাটস, জার্মানির এএফডি, হাঙ্গেরির ভিক্টর অরবান, পোল্যান্ডের ল অ্যান্ড জাস্টিস কিংবা ইতালির জর্জিয়া মেলোনি—সবাই ট্রাম্প বা লে পেনের মতো এই এক বিন্দুতে মিলে যান। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেবল এই মিলটুকুই কি তাঁদের ১৯৩০-এর দশকের নাৎসিবাদ বা ফ্যাসিবাদের মতো ‘উগ্র-ডানপন্থী’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করার জন্য যথেষ্ট? আমার তা মনে হয় না।
বর্তমানের এই জনতাবাদ আর হিটলার বা মুসোলিনির আমলের উগ্র-ডানপন্থার মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে: নাৎসিবাদ ও ফ্যাসিবাদ ছিল মূলত বিস্তারবাদী। তাদের লক্ষ্য ছিল জার্মান (আর্য) বা ইতালীয় (রোমান) জাতির শক্তিকে সীমানার বাইরে ছড়িয়ে দেওয়া। তারা ছিল আক্রমণাত্মক, উগ্র জাতীয়তাবাদী এবং দিগ্বিজয়ী। তারা বিশাল সব ক্যাডার-ভিত্তিক দলের ওপর ভর করে চলত। বর্তমানের এই পপুলিস্টদের পক্ষে নূরেমবার্গের মতো সেই সামরিক ধাঁচের দানবীয় কুচকাওয়াজ আয়োজন করা কল্পনা করাও কঠিন। ফ্রান্সের আরএন-এর ‘সালামি ও ওয়াইন’ পার্টিগুলো নিশ্চিতভাবেই মুসলিম-বিদ্বেষী, কিন্তু হিটলারের সেই যুদ্ধংদেহী মহড়াগুলোর তুলনায় সেগুলো নেহাতই সাদামাটা। নুরেমবার্গের সেই প্রলয়ঙ্করী উন্মাদনা আর হেনিন-বিউমন্টের এই সাধারণ রাজনৈতিক সভা—এই দুইয়ের তুলনা করা কি মোটেও বাস্তবসম্মত?
বর্তমানে পশ্চিমা দেশগুলোর যত পপুলিস্ট বা জনতাবাদী আন্দোলন আছে, তার মধ্যে কেবল নেতানিয়াহুর রাজনীতিই ১৯৩০-এর দশকের সেই ‘বিস্তারবাদী’ বা এলাকা দখলের আগ্রাসী মনোভাবের সাথে শতভাগ মিলে যায়। পশ্চিম তীরের বসতি স্থাপন আর গাজায় যে নিধনযজ্ঞ চলছে, তাতে হিটলারবাদের সাথে নেতানিয়াহুবাদের একটি যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া এখন অনিবার্য।
অন্যদিকে ফরাসি, ব্রিটিশ, সুইডিশ, পোলিশ বা হাঙ্গেরীয়দের বিদেশি-বিদ্বেষ কিন্তু নাৎসিবাদ বা ফ্যাসিবাদের মতো নয়; বরং এটি অনেক বেশি আত্মরক্ষামূলক। এরা অন্য দেশ দখল করতে চায় না, বরং নিজেদের বসতভিটায় নিজেরা কর্তৃত্ব বজায় রাখতে চায়। ঠিক এই কারণেই বর্তমান ইউরোপে ‘বর্ণবাদ’ বা জাত্যাভিমানের চেয়েও ‘সাংস্কৃতিক সংঘাত’ বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে—যাকে আমরা স্রেফ ‘বিদেশি-বিদ্বেষ’ বলতে পারি। হিটলারের বর্ণবাদ ছিল ধ্বংসাত্মক ও বৈপ্লবিক, যা পুরো সমাজব্যবস্থাকেই ওলটপালট করে দিয়েছিল; কিন্তু এখনকার এই বিদেশি-বিদ্বেষ আসলে রক্ষণশীল। তাই ইউরোপের এই বর্তমান জনতাকে স্রেফ ‘জাতীয়তাবাদী’ বা ‘উগ্র-ডানপন্থী’ বলাটা ঠিক হবে না। তেমনটি বলতে গেলে আমাদের ‘সফট জাতীয়তাবাদ’ বা ‘সফট উগ্র-ডানপন্থা’র মতো স্ববিরোধী শব্দ ব্যবহার করতে হবে। তার চেয়ে বরং একে ‘গণ-রক্ষণশীলতা’ (Popular Conservatism) বলাই বেশি মানানসই।
নিয়ন্ত্রিত অভিবাসনের পক্ষে থাকা একজন মানুষ হিসেবে আমি বর্তমানের এই বিদেশি-বিদ্বেষের যৌক্তিকতাকে অস্বীকার করতে পারি না। কারণ আমি এই তত্ত্বে বিশ্বাসী যে—একটি নির্দিষ্ট সংস্কৃতি বহনকারী জনসমষ্টি, যারা নিজেদের একটি স্বতন্ত্র জাতি মনে করে, তাদের নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। সহজ কথায় বললে: একটি জাতির অধিকার আছে তার নিজের সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ করার। কিন্তু নাৎসিবাদ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছু; আটলান্টিক থেকে ভোলগা পর্যন্ত সৈন্য মোতায়েন করে অন্য জাতিগুলোকে গোলাম বানানো বা নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া কোনোভাবেই সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের সাথে তুলনীয় নয়।
ট্রাম্পবাদ আসলে এক ধরণের মিশ্র রূপ। এখানে নিজের দেশের ভেতর অভিবাসন ঠেকানোর যেমন একটি রক্ষণশীল দিক আছে, তেমনি বাইরের পৃথিবীর প্রতি চরম আগ্রাসী হওয়ার প্রবল সম্ভাবনাও রয়েছে। তবে একে ঠিক চিরাচরিত ‘বিস্তারবাদ’ বলা যাবে না। বরং আমেরিকার আগের সেই বিশাল সামরিক শক্তি আর ডলারের দাপটই ট্রাম্পকে অন্য জাতি ও দেশের ওপর সহিংসতা চালানোর সুযোগ করে দিয়েছে—হোক সেটা ভেনেজুয়েলা, ইরান, আমরা (পশ্চিম ইউরোপের অনুগত দেশগুলো), কিংবা ফিলিস্তিনিদের মতো আরবরা।
১৯৬৭ সাল থেকে ইসরায়েল যেভাবে মার্কিন সাম্রাজ্যের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে, তাতে ২০২৫ সালে এসে ট্রাম্পবাদ আর নেতানিয়াহুবাদকে আলাদা করা প্রায় অসম্ভব। ট্রাম্প নোবেল পুরস্কার পাওয়ার মতো যত ভাঁড়ামোই করুন না কেন, গাজায় যে নিধনযজ্ঞ চলছে তার প্রধান কারিগর আসলে তিনিই। দীর্ঘ সময় ধরে ইসরায়েলি সহিংসতাকে উসকে দেওয়ার মাধ্যমেই তিনি ট্রাম্পবাদকে কার্যত হিটলারবাদের পাশে দাঁড় করিয়েছেন। ট্রাম্প এখনো সবকিছুর কলকাঠি নাড়ছেন; তার নির্দেশেই নেতানিয়াহুর এই গণহত্যা কখনো ত্বরান্বিত হয়, আবার কখনো থমকে দাঁড়ায়। তবে আমি সৌভাগ্যবান যে, এই লেখাটি লেখার সময় কাতারে ইসরায়েলি হামলার বিপরীতে আরব দেশগুলোর প্রতিক্রিয়া—বিশেষ করে সৌদি আরব ও পাকিস্তানের কৌশলগত জোট দেখে ট্রাম্প কিছুটা ভয় পেয়েছেন এবং পিছু হটেছেন। তিনি নেতানিয়াহুকে কাতারে বোমাবর্ষণের জন্য ক্ষমা চাইতে বলেছেন এবং নেতানিয়াহু তা মেনে নিয়েছেন। এমনকি হামাসের সাথে চুক্তির জন্য ট্রাম্প চাপ দিলে নেতানিয়াহু তাতে সই করতে বাধ্য হয়েছেন। এরপর কী হবে? ট্রাম্প একজন বিকারগ্রস্ত মানুষ, তাই আগেভাগে কিছুই বলা সম্ভব নয়।
‘ট্রাম্পো-নেতানিয়াহুবাদ’—শব্দটি শুনতে বেশ কদর্য মনে হলেও এর মাধ্যমে ২০০০-২০২৫ সালের আমেরিকান সংকটের সাথে ১৯২০-১৯৪৫ সালের জার্মান সংকটের একটি মিল খুঁজে পাওয়া যায়। আর সেই মিলের জায়গাটি হলো ‘ইহুদি প্রশ্ন’।
আমার বিশ্বাস, ট্রাম্পের এই কট্টর ইসরায়েল-পন্থী আচরণের আড়ালে আসলে এক বিষাক্ত ইহুদি-বিদ্বেষ লুকিয়ে আছে। নেতানিয়াহুর এই সহিংস রাজনীতি ইহুদি ইতিহাসের এক ভয়াবহ অধ্যায়, যা অনেকটা ক্যান্সারের মতো। এখন সব ইহুদিকেই যদি এই ‘নেতানিয়াহুবাদে’র সাথে এক করে দেখা হয়, তবে নাৎসিদের সেই পুরনো ধারণাটাই আবার ফিরে আসবে—যেখানে গোটা ইহুদি জাতিকে এক ‘দানবীয় জাতি’ হিসেবে দেখা হতো। আমি একেই বলছি ‘অ্যান্টি-সেমিটিজম ২.০’ বা আধুনিক ইহুদি-বিদ্বেষ।
আমি জানি খুব কম পাঠকই আমার এই কথার সাথে একমত হবেন। তবে আমি এখানে কেবল ওল্ড টেস্টামেন্টের মতো করে বলছি: “আমাদের তো শক্তিশালী বা ক্ষমতাধরদের পাশে থাকার জন্য বেছে নেওয়া হয়নি। ইতিহাস সবসময় আমাদের সামনে এই ফাঁদ পেতে রাখে।”
কতবার এমন হয়েছে যে—আর্থিক বা বুদ্ধিবৃত্তিক সাফল্য, কিংবা বলশেভিক পার্টির মতো প্রভাবশালী দলে নিজেদের গুরুত্ব দেখে ইহুদিরা ভেবেছে তারা রক্ষা পেয়ে গেছে। তারা ভেবেছে কোনো সাম্রাজ্য বা ক্ষমতাধর কর্তৃপক্ষ তাদের নিরাপত্তা দেবে। কিন্তু দিনশেষে তাদের সেই হিংস্র জনতার মুখেই ঠেলে দেওয়া হয়েছে। আমার বুক ফেটে যায় যখন দেখি ফ্রান্সের অনেক ইহুদি আজ নিজেদের ‘বিজয়ী পক্ষ’ মনে করে নেতানিয়াহুর নীতিকে সমর্থন করছে। আসলে তারা এক বিশাল ফাঁদে পা দিচ্ছে। ট্রাম্পের কারণে আজ গোটা পৃথিবী ইহুদি-বিদ্বেষী হয়ে উঠছে।
আমেরিকার অধিকাংশ ইহুদি নেতানিয়াহুর এই পথ প্রত্যাখ্যান করেছে; তারা অনেক বেশি বুদ্ধিমান এবং ন্যায়পরায়ণ। কিন্তু এরই মধ্যে যেসব ইহুদি—তাঁরা একাডেমিক হোন বা সাধারণ মানুষ—নেতানিয়াহুর বিরোধিতা করছেন, তাঁদেরকেই উল্টো ‘ইহুদি-বিদ্বেষী’ হিসেবে সন্দেহ করা হচ্ছে। এক অদ্ভুত বিকৃত সময় চলছে এখন। চারদিকে কেবল ট্রাম্পবাদের জয়জয়কার।
এই ফাঁদটি কখন বন্ধ হবে? একদিন অনিবার্যভাবে খ্রিস্টান রাষ্ট্রগুলো ১৬০ কোটি মুসলিমদের সাথে আপোষ করবে। তখন এই ইহুদিদের তাদের তথাকথিত ভক্তরা (যেমন ট্রাম্প বা কট্টর ডানপন্থীরা) মাঝপথে ফেলে চলে যাবে। তারা একা হয়ে পড়বে এবং আবারও ক্রুদ্ধ জনতার রোষানলে নিক্ষিপ্ত হবে।
একটির পর একটি ‘প্রতিশ্রুত ভূমি’ আসে, আর তাদের পিছু পিছু আসে মহাবিপর্যয়। মহান আমেরিকান কল্পবিজ্ঞান লেখক আইজ্যাক আসিমভের একটি ছোটগল্প আছে—’নাইটফল’ (Nightfall)। আমার কাছে এটি ইহুদি ইতিহাসের সেই দীর্ঘ নাটকের একটি নিখুঁত রূপক বলে মনে হয়: একটি শক্তিশালী সভ্যতার ভেতরে কোনো এক ভবিষ্যৎবক্তা এক রহস্যময় মহাবিপর্যয়ের ঘোষণা দেয়… সেই বিপর্যয় আসে, সবাইকে অবাক করে দেয়… সভ্যতা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে… তারপর আবার ধীরে ধীরে নতুন সভ্যতার জন্ম হয়, তা ফুলেফেঁপে ওঠে… আবারও কোনো এক ভবিষ্যৎবক্তা রহস্যময় এক মহাবিপর্যয়ের ঘোষণা দেয়… এবং তা আবারও সবাইকে চমকে দিয়ে হাজির হয়…।
আমরা ভেবেছিলাম ১৯৩০-এর দশকের ভয়াবহ ইহুদি-বিদ্বেষ বা বিতর্কগুলো বুঝি ইতিহাস হয়ে গেছে। কিন্তু বর্তমানে পশ্চিমারা আবারও যেভাবে ইহুদিদের নিয়ে মেতে উঠেছে (তা সে সমর্থন বা বিরোধিতা যা-ই হোক), তা প্রমাণ করে যে অতীত আসলে শেষ হয়ে যায়নি। বরং অতীতের সেই বিপদের ছায়া বর্তমানের ওপর এখনও রয়ে গেছে।
জম্বি প্রোটেস্ট্যান্টবাদ ও নাৎসিবাদ, শূন্য প্রোটেস্ট্যান্টবাদ ও ট্রাম্পবাদ
১৯২৯ সালের অর্থনৈতিক মহামন্দা জার্মানিতে হিটলারের উত্থানের একটি নির্ণায়ক কারণ হিসেবে সর্বজনবিদিত। ষাট লক্ষ বেকার মানুষ জার্মান সমাজকে এমন এক অবস্থায় ঠেলে দিয়েছিল, যেখানে কোনো আদর্শিক বাধাই আর কাজ করছিল না। মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে হিটলার বেকারত্ব দূর করে দিলেন। আর তাতেই উদারনীতিবাদের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠোকা হয়ে গেল।
নাৎসিবাদের উত্থানে ধর্মীয় প্রেক্ষাপটের ভূমিকা অত্যন্ত গভীর হলেও এই বিষয়টি সাধারণ আলোচনায় খুব একটা আসে না। ১৮৭০ থেকে ১৯৩০ সালের মধ্যে জার্মানিতে প্রোটেস্ট্যান্ট ধর্মবিশ্বাস ক্রমেই স্তিমিত হয়ে আসছিল—শুরুতে শ্রমিক শ্রেণির মধ্যে, পরে তা ছড়িয়ে পড়ে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তদের মাঝেও। তবে ক্যাথলিক অঞ্চলগুলো এই ধর্মীয় অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পেরেছিল। ফলে ১৯৩২ ও ১৯৩৩ সালের নির্বাচনের মানচিত্র লক্ষ্য করলে দেখা যায়, নাৎসিদের প্রধান ভোটব্যাংক ও প্রোটেস্ট্যান্ট অঞ্চলের মানচিত্র হুবহু মিলে যাচ্ছে।
প্রোটেস্ট্যান্ট ধর্মতত্ত্বে মানুষে-মানুষে সমান অধিকারে কোনো বিশ্বাস ছিল না। তাদের দর্শন অনুযায়ী, ঈশ্বর জন্মের আগেই কাউকে ‘মনোনীত’ (Chosen) করে রাখেন, আর কাউকে করেন ‘অভিশপ্ত’। যখন মানুষের মন থেকে এই ধর্মবিশ্বাস বিলীন হয়ে গেল, তখন সেই অসাম্যের জায়গায় তৈরি হলো এক গভীর শূন্যতা ও সামাজিক আতঙ্ক। আর সেই শূন্যস্থান থেকেই জন্ম নিল নতুন ধরণের ঘৃণা; যাদেরকে একসময় ‘ধর্মীয়ভাবে অভিশপ্ত’ মনে করা হতো, এখন তাদেরকেই ‘জৈবিকভাবে নিম্নতর’ বা অস্পৃশ্য তকমা দিয়ে ইহুদি ও স্লাভদের ওপর গণহত্যা চালানো হলো।
অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ক্যালভিনিস্ট প্রোটেস্ট্যান্টরা কৃষ্ণাঙ্গদের বৈষম্যের লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছিল। তবে বাইবেলের প্রাচীন বিধানের ওপর অতি-নির্ভরশীলতার কারণে এই ক্যালভিনিস্টরা নিজেদের হিব্রু জাতির উত্তরসূরি মনে করত। একারণেই ১৯৩০-এর দশকে আমেরিকায় ইহুদি-বিদ্বেষ অনেক কম ছিল এবং ইহুদিরা এক ধরণের সামাজিক সুরক্ষা পেয়েছিল। কিন্তু পরিস্থিতি তখন থেকেই বদলাতে শুরু করে, যখন আধুনিক ‘ইভানজেলিক্যাল’ আন্দোলনটি মানুষের কল্যাণের চেয়ে ‘ইসরায়েল রাষ্ট্রকে’ কেন্দ্র করে এক ধরণের অন্ধ আবেশে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে।
ক্যাথলিক ফ্রান্সে (বিশেষ করে প্যারিস এবং ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলীয় অঞ্চলে) ১৭৩০ সাল থেকেই ধর্মীয় বিশ্বাস ও আচারে ধস নামতে শুরু করে। আগে ‘ব্যাপটিজম’ বা দীক্ষাদানের মাধ্যমে আদি পাপ থেকে মুক্তি পেয়ে স্বর্গে যাওয়ার যে সমান সুযোগ সবার ছিল, সেই ধারণাটিই বদলে গিয়ে নাগরিকদের সমানাধিকার এবং ইহুদিদের মুক্তির পথ তৈরি করে দেয়। ‘সর্বজনীন ক্যাথলিক খ্রিস্টান’ (গ্রিক শব্দ ‘ক্যাথলিকোস’ মানেই সর্বজনীন) ধারণার জায়গা দখল করে নেয় প্রজাতন্ত্রের ‘সর্বজনীন মানুষ’-এর ধারণা।
নাৎসিবাদের তুলনায় এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি কর্মসূচি ছিল। তবে নাৎসিবাদের অনেক আগে এটিই ছিল ধর্মের জায়গায় কোনো ‘আদর্শ’ বা আইডিওলজির প্রথম বিশাল ও গণ-প্রতিস্থাপন। বিপ্লবী ফ্রান্স এবং নাৎসি জার্মানি—উভয় ক্ষেত্রেই দেখা যায়, ধর্মবিশ্বাস হারিয়ে গেলেও সমাজ ও নৈতিকতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে ধর্মের প্রভাবটুকু টিকে গিয়েছিল। মানুষ তখনও নিজেদের জাতি বা শ্রেণির অবিচ্ছেদ্য অংশ মনে করত; তাদের কাজের নীতি এবং স্বজাতির প্রতি দায়বদ্ধতা ছিল অটুট। এর ফলে তাদের সম্মিলিতভাবে কাজ করার ক্ষমতা বহুগুণ বেড়ে গিয়েছিল।
ধর্মের এই অবস্থাকেই আমি বলি ‘ধর্মের জম্বি দশা’—অর্থাৎ যেখানে ধর্ম বিশ্বাস হিসেবে মৃত, কিন্তু তার সামাজিক কাঠামো বা অভ্যাসগুলো তখনও জীবিত ও সক্রিয়। নাৎসিবাদ আসলে এই ‘জম্বি দশা’ থেকেই শক্তি সঞ্চয় করেছিল; আর দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি যে, এই কারণেই তাদের অর্থনৈতিক ও সামরিক কর্মদক্ষতা ছিল এতোটা প্রবল।
মতাদর্শের এই ধর্মীয় ব্যাখ্যার সাথে পারিবারিক কাঠামোর একটি সহায়ক বিশ্লেষণ যুক্ত করা যেত। জার্মানিতে পরিবার ছিল বৈষম্যমূলক, অন্যদিকে প্যারিস অববাহিকার সমাজ ছিল সমতাভিত্তিক। তবে আপাতত এটুকু বলাই যথেষ্ট যে প্রোটেস্ট্যান্টবাদ থেকে নাৎসিবাদে এবং ক্যাথলিকবাদ থেকে ফরাসি বিপ্লবে এক ধরণের ঐতিহাসিক বিবর্তন কাজ করেছে।
ট্রাম্পবাদের পরতে পরতে সেই প্রোটেস্ট্যান্টবাদের ছায়া স্পষ্ট, যেখানে সামাজিক অসাম্য আর কৃষ্ণাঙ্গ-বিদ্বেষ একে অপরের হাত ধরে চলে। তবে এখানে ধর্ম আর ‘জম্বি’ দশায় নেই, বরং তা এখন সম্পূর্ণ শূন্যের কোঠায়। ফলে সাধারণ নৈতিকতা উবে গেছে এবং সামাজিক কর্মক্ষমতাও লোপ পেয়েছে। মানুষ এখন শেকড়হীন হয়ে ভাসছে, বিশেষ করে আমেরিকার এই চরম ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও খণ্ডিত একক পরিবার ব্যবস্থায় যেখানে উত্তরাধিকারের সুনির্দিষ্ট কোনো নিয়ম নেই। তাই ট্রাম্পবাদী উগ্রতা থেকে কোনো স্থিরতা আশা করা ঠিক হবে না। এতে অসাম্য থাকবে ঠিকই, কিন্তু সেই উন্মাদনা হবে চরম অস্থির। এই বিশৃঙ্খলার মূল উৎস কেবল একজন অসভ্য বা নিষ্ঠুর প্রেসিডেন্টের মগজে নয়, বরং খোদ সমাজের গভীরে। তবে আমাদের জন্য স্বস্তির দিক হলো যে এই অবস্থায় সুশৃঙ্খল কোনো অর্থনৈতিক বা সামরিক বড় পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষমতা আগের চেয়ে অনেক কমে এসেছে।
ট্রাম্পবাদ প্রসঙ্গে আরও একটি জরুরি বিষয় হলো এর ছদ্ম-ধর্মীয় শূন্যবাদ। এখানে বাইবেলের এক কদর্য ব্যাখ্যা হাজির করা হয় যেখানে মূলত বিত্তশালীদের মহিমা প্রচার করা হয়। বর্ণবাদের নিরিখে ট্রাম্পবাদ নাৎসিবাদের মতো অতটা উগ্র না হলেও অর্থনৈতিক অনৈতিকতার দিক থেকে এটি অনেক বেশি পঙ্কিল।
নাৎসিবাদ ছিল সরাসরি এবং স্পষ্টভাবে খ্রিস্টধর্মের বিরোধী। অন্যদিকে ট্রাম্পবাদ ধর্মের দোহাই দিলেও আসলে তা এক শয়তানি গোষ্ঠীর মতো কাজ করে, যারা আদর্শ ও মূল্যবোধকে পুরোপুরি উল্টে দেয়। তারা মন্দকে ভালো আর অবিচারকে ন্যায় হিসেবে চালিয়ে দেয়। হিটলার ছিলেন কেবল একজন ‘ফুয়েরার’ বা পথপ্রদর্শক, যিনি জার্মান জাতিকে ধ্বংসের পথে নিয়ে গিয়েছিলেন। ট্রাম্প নিজে শয়তান না হলেও তাঁর অন্ধ ভক্তদের কাছে ওই লাল টুপিটি হয়তো দাজ্জাল বা অ্যান্টিক্রাইস্টের মুকুটের মতো পবিত্র।
লে পেন-বাদের গোড়ায় কিন্তু প্রোটেস্ট্যান্টদের সেই বৈষম্যমূলক উত্তরাধিকার নেই। এখানেই ন্যাশনাল র্যালির আসল রহস্য লুকিয়ে আছে। এই বিদেশি-বিদ্বেষী দলটির জন্ম হয়েছে মূলত ক্যাথলিক প্রধান অঞ্চলে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, ভূমধ্যসাগরীয় উপকূল আর প্যারিস অববাহিকার যেসব এলাকা বর্তমানে এদের ঘাঁটি, সেগুলো একসময় ছিল বিপ্লবের দুর্গ। সেখানকার পরিবারগুলো ঐতিহাসিকভাবে সাম্যবাদী দর্শনে বিশ্বাসী এবং আঠারো শতক থেকেই তারা ধর্মবিমুখ। তাহলে প্রশ্ন জাগে, এই র্যালি কি আদতে সাম্যবাদী নাকি বৈষম্যবাদী? এই রহস্য হয়তো তাদের নিজেদের কাছেও পরিষ্কার নয়।
অন্যদের প্রত্যাখ্যান করার যে প্রবণতা তাদের মধ্যে দেখা যায়, তা আসলে এক ধরণের বিকৃত সাম্যবাদ থেকে আসা। তারা অভিবাসীদের মৌলিকভাবে আলাদা কিছু মনে না করলেও তাদের দ্রুত ফরাসি সংস্কৃতিতে মিশে যাওয়ার দাবি তোলে। ন্যাশনাল র্যালি অভিবাসীদের সরাতে বদ্ধপরিকর হলেও তাদের বারবার পিছু টানে ফরাসিদের সেই পুরনো সাম্যবাদী ঐতিহ্য। কারণ তাদের ভোটাররা শুধু অভিবাসীদেরই নয়, বরং অতিধনী এবং ক্ষমতাবান অভিজাতদেরও সমানভাবে ঘৃণা করে। ঠিক এই কারণেই ফ্রান্সে ডানপন্থীদের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী ঐক্য গড়া অত্যন্ত কঠিন। যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাজ্যে বিদেশিদের তাড়ানোর নামে ধনী আর গরিব শ্বেতাঙ্গদের মধ্যে জোট গড়া সহজ, কারণ সেখানে রক্ষণশীল সাধারণ মানুষ আর অভিজাত ডানপন্থীরা দ্রুত একমত হতে পারে। কিন্তু ফ্রান্সে বিত্তবান আর সাধারণ মানুষের এই বিদেশিবিরোধী জোট শ্রেণিবৈষম্যের কারণে বারবার তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে।
সার্বজনীনতাবাদী বা ‘সবাই সমান’ তত্ত্বে বিশ্বাসী এই বিদেশিবিদ্বেষের ভয়াবহতাকে কোনোভাবেই ছোট করে দেখার উপায় নেই। এটি খুব দ্রুতই উগ্র বর্ণবাদে রূপ নিতে পারে। কারণ, যে মানুষ মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে যে দুনিয়ার সব মানুষই একরকম, সে যখন সম্পূর্ণ ভিন্ন রীতিনীতি বা সংস্কৃতির কোনো মানুষের মুখোমুখি হয়, তখন সে চরম বিভ্রান্তিতে পড়ে। তার তখন মনে হতে পারে যে, এই ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের মানুষগুলো বোধহয় আর মানুষের কাতারেই পড়ে না।
ফরাসি বিপ্লব যেমন ছিল ‘জম্বি ক্যাথলিকবাদ’-এর ফল, তেমনি বর্তমানের এই ‘ন্যাশনাল র্যালি’ হলো ধর্মের সেই ‘শূন্য দশা’ বা শূন্য ক্যাথলিকবাদের ফসল। আর ঠিক একারণেই এই দলটির পক্ষে কোনো সুসংহত বা ঐক্যবদ্ধ জাতীয় লক্ষ্য বা পরিকল্পনা তৈরি করা সম্ভব নয়। র্যালি এবং ফ্রান্সের বর্তমান বিশৃঙ্খলার ভবিষ্যৎ নিয়ে আমার আরও বিশদ আলোচনার পরিকল্পনা আছে। তবে সেই আলোচনাটি এই লেখার মতো কেবল ব্যক্তিগত উপলব্ধি বা ভাসাভাসা পর্যবেক্ষণনির্ভর হবে না, বরং তা হবে পুরোপুরি যুক্তিনির্ভর এবং তথ্যসমৃদ্ধ।
আসলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা উচিত, বিশেষ করে যারা কথায় কথায় আজকের পরিস্থিতিকে ১৯৩০-এর দশকের সাথে তুলনা করেন। হিটলারবাদ, ট্রাম্পবাদ বা লে পেন-বাদের ধর্মীয় ও সামাজিক প্রেক্ষাপট বোঝার মতো গভীর ঐতিহাসিক জ্ঞান টেলিভিশন টকশো-র আলোচকদের কাছে প্রত্যাশা করা হয়তো কঠিন। কিন্তু অন্তত এটুকু তো আশা করা যায় যে, তারা অতীত ও বর্তমানের এই মতাদর্শগুলোকে একটু সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বিচার করবেন। অথচ তারা অলসভাবে সবকিছুকেই ‘উগ্র-ডানপন্থা’র একই ঝুড়িতে ফেলে দেন। অথচ অতীত আর বর্তমানের এই পার্থক্যটা দিবালোকের মতো পরিষ্কার।
নাৎসিবাদ আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগের সেই কট্টর ডানপন্থী আন্দোলনগুলোর মূল শক্তি ছিল মধ্যবিত্ত এবং বিশেষ করে উচ্চ-মধ্যবিত্ত সমাজ। তারা তখন শ্রমিক ইউনিয়ন, সামাজিক গণতান্ত্রিক বা কমিউনিস্ট আন্দোলনগুলোর ভয়ে তটস্থ থাকত এবং নিজেদের অস্তিত্ব বিপন্ন মনে করত। সেই সময়কার মধ্যবিত্তরা ছিল প্রচণ্ড উত্তেজিত; তারা নারীদের গৃহবন্দী রাখতে চাইত আর সমকামীদের ওপর চালাত চরম নিপীড়ন।
আজকের চিত্রটা কিন্তু ঠিক এর উল্টো। বর্তমানের এই তথাকথিত ‘উগ্র-ডানপন্থা’র প্রাণশক্তি হলো মূলত শ্রমজীবী সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে যারা বিশ্বায়নের কবলে পড়ে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু হয়ে গেছে কিংবা অভিবাসনের চাপে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে আজকের উচ্চশিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজ এই আন্দোলনে খুব একটা প্রভাবিত নয়। উচ্চশিক্ষা আর ভালো উপার্জনের সুবাদে এই উচ্চ-মধ্যবিত্ত শ্রেণি এখন প্রায় পুরোপুরি নিরাপদ একটি জীবন যাপন করছে।
ঠিক এই কারণেই আমি একে ‘উগ্র-ডানপন্থা’ না বলে ‘গণ-রক্ষণশীলতা’ বলতে পছন্দ করি। যেহেতু এর শেকড় সমাজের নিচের স্তরে, তাই এই আন্দোলন স্বভাবতই রক্ষণাত্মক বা আত্মরক্ষামূলক। যাদের প্রতিদিনের জীবনটাই টিকে থাকার এক কঠিন লড়াই, তারা আর যাই হোক পুরো ইউরোপ বা দুনিয়া জয়ের স্বপ্ন দেখে যুদ্ধ বাধাতে যাবে না।
তবে এখানেই আলোচনা থামিয়ে দিলে ভুল হবে। আমাদের আরও গভীরে যাওয়া দরকার। আমরা এতক্ষণ অতীতের মতাদর্শের সাথে বর্তমানের মতাদর্শের তুলনা করেছি; এবার চলুন দেখা যাক অতীতের সামাজিক শ্রেণির সাথে বর্তমানের সামাজিক শ্রেণির আসল তফাতটা কোথায়।
দুই বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে ইউরোপের মধ্যবিত্ত সমাজ অনেকটা দিশেহারা হয়ে পড়েছিল। অন্যদিকে শ্রমিক শ্রেণি ছিল তুলনায় অনেক বেশি বাস্তববাদী। কিন্তু আজকের উচ্চ-মধ্যবিত্ত সমাজের দিকে তাকালে কী দেখি? তারা কি আসলেই সুস্থ বা শান্তিকামী? তাদের স্বপ্নটা আসলে কী?
আসলে তারা এক ধরণের বিভ্রমের মধ্যে বাস করছে। ইউরোপের বৈচিত্র্যকে অস্বীকার করে একটি ‘জাতি-রাষ্ট্রহীন’ ইউরোপ গড়ার স্বপ্ন দেখা নেহাতই একটা মরীচিকা। এই ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী হয়েই ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রাক্তন সোভিয়েত অঞ্চলগুলোর দিকে আগ্রাসীভাবে হাত বাড়িয়েছে। রাশিয়ার কাছে অর্থনৈতিক লড়াইয়ে হেরে যাওয়ার পর এই ইউনিয়নের আক্রমণাত্মক মনোভাব আরও বেড়ে গেছে। তারা এখন ব্রিটেন, ফ্রান্স বা জার্মানির মতো দেশগুলোকে একটি সরাসরি যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। কী অদ্ভুত এক পরিহাস—পশ্চিমা অভিজাতরা আজ অবিকল হিটলারের সেই ‘রাশিয়া ধ্বংস করার’ স্বপ্নটাকেই নতুন করে লালন করছে!
সামাজিক শ্রেণির এই তুলনামূলক বিচার আমাদের এক নতুন সত্যের মুখোমুখি করে। তথাকথিত ‘ইউরোপবাদ’ বা ‘ম্যাক্রোঁবাদ’ তাদের এই বহির্মুখী আগ্রাসনের কারণে আজ ১৯৩০-এর দশকের সেই কট্টর ডানপন্থার সমান্তরালে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে আজ যেভাবে তথ্যের স্বাধীনতা এবং ভোটাধিকার হরণ করা হচ্ছে, তাতে একে একটি উগ্র-ডানপন্থী কাঠামো বলাই বেশি সংগত। সেই অর্থে ১৯৩০-এর দশকের সাথে বর্তমানের তুলনা করাটা কেবল জরুরিই নয়, বরং অপরিহার্য।
এই বিশাল ইউরোপীয় প্রকল্পের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক ধরণের মানসিক বিকার বা চরম মাত্রার ‘প্যারানয়া’। নাৎসিদের প্যারানয়ার কেন্দ্রে ছিল ইহুদি এবং ‘ইহুদি-বলশেভিজম’-এর ভয়। আর আজকের ইউরোপীয় প্যারানয়ার ঠিক কেন্দ্রে রয়েছে রাশিয়া।
এখনও ইউরোপের শাসক শ্রেণির মানসিক অবস্থা বিশ্লেষণ করা সম্ভব। ট্রাম্পের পুনর্নির্বাচনের পর যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা আমাদের নতুন কিছু দেখাচ্ছে। বিশেষ করে এই খামখেয়ালি প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে কথা বলার যে আগ্রহ দেখাচ্ছেন, তা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় আমাদের নেতারা বাস্তব জগৎ থেকে কতটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। এই বিভ্রান্তির পর্যায়গুলো একটু গুছিয়ে বললে নিচের মতো দাঁড়ায়।
এর শুরুটা হয়েছিল ২০১৪ সালের দিকে। অর্থাৎ মাইদান বিপ্লবের আগে, চলাকালীন এবং ঠিক পরের ঘটনা। আসলে মাইদান ছিল একটি অভ্যুত্থান যা ইউক্রেনকে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছিল। এই পুরো ঘটনার নেপথ্যে মূল কারিগর ছিল আমেরিকা ও জার্মানির কৌশলী কূটনীতিকরা। এরপরের ঘটনাক্রমগুলো ছিল অনেকটা এই রকম।
– ২০১৪-২০২২: রাশিয়াকে উসকানি দেওয়া হলো, অথচ তারা আগেভাগেই সতর্ক করেছিল যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন আর ন্যাটোর হাতে ইউক্রেনের অন্তর্ভুক্তি তারা মোটেও সহ্য করবে না। কাজ সফল। পুতিন ইউক্রেন আক্রমণ করলেন।
– ২০২২-২০২৫: এই উসকানির ফলে আমাদের ওপর যে অর্থনৈতিক যুদ্ধটা চেপে বসল, তাতে হার মেনে নিতে হলো। আমাদের সমাজগুলো এখন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ছে।
– ২০২২-২০২৫: এবার সরাসরি যুদ্ধটাতেই হেরে গেলাম, যে যুদ্ধ কিভ প্রশাসন আমাদের হয়ে লড়ছে। সেটা এখন চলমান।
২০২৫ সাল থেকে ইউরোপীয় সরকারগুলোর এক সমান্তরাল বা কাল্পনিক বাস্তবতায় প্রবেশের পালা শুরু হলো।
আজকের ইউরোপে আমরা আসলে একদল উন্মাদের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছি। বা আরও স্পষ্ট করে বললে, এক ধরণের সামষ্টিক উন্মাদনা আমাদের সমাজের প্রভাবশালী শ্রেণির মানুষকে দলবদ্ধভাবে গ্রাস করেছে। শুধু ফ্রান্সের দিকে তাকালেই দেখা যায়—হাজার হাজার সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী, ব্যবসায়ী নেতা আর আমলারা এক অদ্ভূত ঘোরের মধ্যে বাস করছেন। তারা সবাই মিলে এক অলীক কল্পনা বা ‘কালেক্টিভ হ্যালুসিনেশন’-এ ভুগছেন যে, রাশিয়া বুঝি গোটা ইউরোপ দখল করে নেবে (একে বলে প্যারানয়া)। এর জন্য এককভাবে কোনো ব্যক্তিকে দায়ী করা যাবে না; আমরা আসলে এক ভয়াবহ সামষ্টিক মনস্তাত্ত্বিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি।
ধর্মের সেই শূন্যগর্ভ দশা থেকে জন্ম নেওয়া ব্যক্তিসত্তার এই যে সঙ্কোচন—আমি নিশ্চিত, এটিই আজকের এই রুশ-বিদ্বেষী মৎস্যকুলের উত্থানের মূল কারণ।
আমার গ্রন্থ ‘একুশ শতকের ফ্রান্সে শ্রেণি সংগ্রাম’-এ আমি যেমনটা ব্যাখ্যা করেছি: যৌথ বিশ্বাসের এই যে তিরোধান—প্রথমে ধর্মীয় বিশ্বাস, এবং পরবর্তীতে ‘জম্বি রিলিজিয়ন’ বা ধর্মের প্রেতচ্ছায়া থেকে আসা আদর্শিক বিশ্বাসগুলোর যে বিনাশ—তা মূলত মানুষের ‘সুপার ইগো’ বা উচ্চতর নৈতিক সত্তার এক চরম ধস নামিয়েছে। যারা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য বা ‘ইগো’র মুক্তির তকমা নিয়ে ঘোরেন, আমি তাদের মতো সুপার ইগোকে কেবল দমনমূলক কোনো ব্যবস্থা মনে করি না। বরং সুপার ইগো হলো ইগোর সেই আদর্শ প্রতিচ্ছবি, যা মানুষের ভেতরে ইতিবাচক নৈতিক ও সামাজিক মূল্যবোধের নোঙর গেড়ে দেয়।
সম্মান, সাহস, ন্যায়বিচার আর সততা—এই বোধগুলোর উৎস এবং শক্তির আধার হলো এই সুপার ইগো। এটি দুর্বল হলে মূল্যবোধগুলোও দুর্বল হয়; আর এটি অদৃশ্য হলে ওগুলোও বিলীন হয়ে যায়। পরিণামে, ধর্ম আর মতাদর্শের অবসান মানুষকে মুক্ত করেনি, বরং ক্ষুদ্রতর করেছে। উচ্চশিক্ষিত সেইসব নারী-পুরুষ, ধর্মের অনুপস্থিতিতে যাদের নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ আজ রুদ্ধ ও স্থবির—তারাই আজ পঙ্গপালের মতো এই রুশ-বিদ্বেষী ব্যাধির বাহক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নাৎসি অ্যান্টি-সেমিটদের মনস্তাত্ত্বিক গঠন ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন ধাঁচের। নিৎশেকে উদ্ধৃত করে বলতে হয়— ‘ঈশ্বরের মৃত্যু’ নিশ্চিতভাবেই তাদের এক ‘ফুয়েরার’ অর্থাৎ পরম নেতার সন্ধানে নামিয়েছিল; কিন্তু তাদের মধ্যে ‘সুপার-ইগো’-র অভাব ছিল না। তারা যৌথভাবে অসাধ্য সাধনে সক্ষম ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মান সেনাবাহিনীর সেই ট্র্যাজিক বীরত্বই এর প্রমাণ। আজ কি কেউ কল্পনাও করতে পারেন যে আমাদের উচ্চ-মধ্যবিত্ত শ্রেণি তাদের নিজ নিজ জাতির সামনে দাঁড়িয়ে কিয়েভ বা খারকিভের দিকে মৃত্যুর মুখে ছুটে যাচ্ছে?
ইউক্রেনে আমাদের এই যুদ্ধটা একটা তামাশা মাত্র। এটা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের মুক্তি আর তথাকথিত ‘পার্সোনাল ডেভেলপমেন্ট’ বা আত্মিক উন্নয়নের এক অদ্ভুত ফসল। এখানে কেবল ইউক্রেনীয় আর রাশিয়ানরাই মরবে।
অবশ্য, যদি না…
থার্মোনিউক্লিয়ার যুদ্ধে তো নায়কের প্রয়োজন পড়ে না।













Comments